প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যাবস্থায় তক্ষশীলা শিক্ষাকেন্দ্রের গুরুত্ব আলোচনা করো

প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যাবস্থায় তক্ষশীলা শিক্ষাকেন্দ্রের গুরুত্ব আলোচনা করো
অথবা, প্রাচীন ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দাও। 
অথবা, প্রাচীন ভারতের যে-কোনাে একটি শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষাব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। 

উত্তর : 

প্রাচীন ভারতের শিক্ষাকেন্দ্র — তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় : 

প্রাচীন ভারতের উচ্চশিক্ষার একটি খ্যাতনামা কেন্দ্র হল তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বৈদিক যুগে স্থাপিত হয়। এটি বৌদ্ধ যুগ পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। নীচে এই শিক্ষাকেন্দ্রটির সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলােচনা করা হল —

[1] অবস্থান : বর্তমান পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডি থেকে 20 মাইল উত্তর-পশ্চিমে গাধার রাজ্যে তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত ছিল। প্রায় 12 মাইলজুড়ে ছিল তক্ষশিলা নগরীর অবস্থান। 

[2] সময়সীমা : আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় অব্দ পর্যন্ত প্রায় 400 বছর ধরে তক্ষশিলার গৌরবময় অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। 

[3] শিক্ষাব্যবস্থা : ষােলাে বছর বয়সের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ শেষ করে, উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা তক্ষশিলায় আসত। এই শিক্ষাব্যবস্থা পুরােপুরি আবাসিক ছিল না, গুরুগৃহে বা পৃথকভাবেও থাকা যেত। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরাই শিক্ষার সুযােগ পেত। শূদ্ররা এখানে পঠনপাঠনের সুযােগ পেত না। 

[4] শিক্ষার ব্যয়ভার : তক্ষশিলাতে পঠনপাঠনের জন্য শিক্ষার্থীকে বেতন দিতে হত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বেতন হিসেবে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা জমা দিতে হত। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা বেতন দিতে না-পারলে নানান ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করত। অনেক ক্ষেত্রে বিত্তবানরা দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীর ব্যয়ভার গ্রহণ করত। 

[5] শিক্ষা পরিচালনা : বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ভার অভিজ্ঞ ও কৃতী অধ্যাপকদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। পাঠক্রম নির্ধারণ, শিক্ষার্থী নির্বাচন এবং নিষ্ঠা ও ধৈর্য্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান সবকাজই গুরুরা তথা অধ্যাপকরা করতেন। 

[6] পাঠক্রম : তক্ষশিলার পাঠক্রমে বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। যেমন—চতুর্বেদ, ইতিহাস, কোরান, দর্শন, কৃষিবিজ্ঞান, পশুপালন, গৃহনির্মাণ, চিকিৎসাশাস্ত্র, রাজকর্ম, বাণিজ্য, শিল্পকলা, অঙ্কন, যুদ্ধবিদ্যা ইত্যাদি। 

[7] শিক্ষাদান পদ্ধতি ও মূল্যায়ন : তক্ষশিলাতে মৌখিক পদ্ধতিতে শিক্ষাদান করা হত। তবে লিপি ও পুথির প্রচলনও ছিল। শিক্ষাক্রম সমাপ্ত হওয়ার পর কেবল মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে অধীত জ্ঞানের পরিমাপ করা হত। বিতর্কসভারও আয়ােজন করা হত। কোনােরুপ লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হত না। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও দলগত—উভয় প্রকার শিক্ষণ পদ্ধতি অনুসৃত হত। 

[8] নিয়মানুবর্তিতা : তক্ষশিলার শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয়কেই নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলতে হত। আর্থিক সংগতি এবং মর্যাদা যে-স্তরেই থাকুক-না-কেন, প্রত্যেককেই একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হত। 

[9] বিশেষ উৎকর্ষ কেন্দ্র : চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুবই সুনাম ছিল। বিশেষ করে শল্যচিকিৎসায় পারদর্শিতা অর্জনের জন্য বহু শিক্ষার্থী তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভরতি হত। চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের শেষে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হত। শিক্ষার্থীরা সাত বছর ধরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাশাস্ত্রের পাঠক্রমে পাঠ গ্রহণ করত। 

তক্ষশিলার বহু কৃতীদের মধ্যে জীবক ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসক, কৌটিল্য ছিলেন অর্থশাস্ত্রের প্রণেতা এবং পাণিনি ছিলেন বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ।

Note: এই আর্টিকেলের ব্যাপারে তোমার মতামত জানাতে নীচে দেওয়া কমেন্ট বক্সে গিয়ে কমেন্ট করতে পারো। ধন্যবাদ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!