তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর বর্ণনা করো | তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর সম্বন্ধীয় বিশেষজ্ঞগণের মতামত

তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর বর্ণনা করো | তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর সম্বন্ধীয় বিশেষজ্ঞগণের মতামত

উত্তর : 

তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর :

M.A. Jullien তুলনামূলক শিক্ষা সম্বন্ধে বলেছেন, “Education and other sciences is based on facts and observations, which should be ranged in analytical tables easily compared in order to deduce principles and definite rules.” তিনি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে সার্থকভাবে গড়ে তােলার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্লেষণ করা প্রয়ােজন বলে মনে করেন। 

কোনাে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে সেদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আর শিক্ষার এই পার্থক্যগত দিক জানা মানুষের সহজাত প্রবণতার অন্তর্গত। বিশেষত উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে মানুষ কৌতুহল বােধ করে এবং নিজ দেশের শিক্ষার সাথে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য বিশ্লেষণ করে। এছাড়া উন্নত বিশ্বের শিক্ষার বিভিন্ন দিক যা নিজ দেশের জন্য গ্রহণযােগ্য ও বাস্তবসম্মত তা প্রচলনের জন্যও ব্যবস্থা করা হয়। এসব কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা জানা অনস্বীকার্য, যা তুলনামূলক শিক্ষার অন্তর্গত।

তুলনামূলক শিক্ষার প্রসারতা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। জ্ঞান অর্জনের ফলে তুলনামুলক শিক্ষা সম্বন্ধীয় সমস্যাও জানা যায় এবং পরবর্তী সমস্যাসমূহ দূরীকরণের ক্ষেত্রে নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। বলা যায়—তুলনামূলক শিক্ষা এখন শিক্ষার আঙিনায় আকর্ষণীয় বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক সময় বিষয়টি নিয়ে পদ্ধতি অনুসরণ করে গবেষণা করা হলেও বর্তমানে বিষয়টিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গবেষণার বিষয় হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার কাজ অব্যাহত রয়েছে। 

পূর্বে শুধুমাত্র বিদেশি শিক্ষার সাথে পরিচিত হবার মধ্য দিয়ে এবিষয়ের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চস্তরে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের কিছু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিষয়টি অধ্যয়ন করা হয়। এছাড়া বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা পদ্ধতির মাধ্যমে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা অর্জনের পথ সুগম করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তুলনামূলক শিক্ষাবিদগণ নানাভাবে বিষয়টিকে সমৃদ্ধ ও চাহিদাসম্পন্ন করে তুলেছেন। তাঁরা আশা পােষণ করেন গবেষক এবং এবিষয়ের পণ্ডিত ব্যক্তিগণের সুষ্ঠু কার্যক্রম দ্বারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিষয়টি অতিআকর্ষণীয় ও গ্রহণযােগ্যতা লাভ করবে। একই সাথে বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিজ দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা প্রদান করবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক শিক্ষা সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জনের সুযােগ রয়েছে। এর ফলে উক্ত দেশগুলাের শিক্ষার সামগ্রিক দিক আজ আর অজানা নেই। অন্যদিকে শিক্ষা সম্বন্ধীয় বিভিন্ন সমস্যা বিবেচনা করে গবেষণার মাধ্যমে তা সমাধানের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার তুলনা করে নিজ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে যা তুলনামূলক শিক্ষার অন্তর্গত বিষয়বস্তু হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়। বর্তমানে শিক্ষাবিদগণ মনে করেন দেশের জনগণের কৃষ্টি, সভ্যতা প্রভৃতি দিক বিবেচনা করে এই শিক্ষাবিস্তারের আরও প্রয়ােজন রয়েছে। শিক্ষা যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া সেহেতু সেই বিষয়ের পরিধিও আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়ােজন। বিভিন্ন গবেষণা, প্রবন্ধ ইত্যাদি প্রণয়নের মাধ্যমে এই শিক্ষার বিস্তার হওয়া সম্ভব বলে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ মত পােষণ করেন।

আমাদের দেশে বিষয়টির প্রচলন খুব বেশিদিনের না হলেও শিক্ষক প্রশিক্ষণ শিক্ষাক্রমে বিষয়টি বিগত প্রায় ত্রিশ বছর পূর্বে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি আকর্ষণীয় বিষয় হিসাবে অধ্যয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর সম্বন্ধীয় বিশেষজ্ঞগণের মতামত :

তুলনামূলক শিক্ষা বিষয়টি নতুন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বিষয়ে অধ্যয়নের অন্তর্গত বিষয়বস্তু ছিল শুধুমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা, কার্যপ্রণালীর নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ। পরবর্তীতে সংযােগ করা হয় বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তথা শিক্ষাব্যবস্থার পার্থক্যগত তুলনামূলক ব্যাখ্যা।

চার্লস লুই মন্তেস্কুয়ের মতামত: ফরাসি শিক্ষাবিদ মন্তেস্কুই সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মতভাবে তুলনামূলক শিক্ষা অধ্যয়নের জন্য কিছু নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেন। নিয়মগুলাে ছিল বিষয়টির ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সহায়ক। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত নিয়মের মধ্য দিয়েই বিষয়টি সমৃদ্ধিলাভ করবে।

আই এল ক্যান্ডেলের মতামত : অধ্যাপক এল ক্যান্ডেল তুলনামূলক শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, এই বিষয়ের শিক্ষা বলতে শুধুমাত্র রাষ্ট্রনীতি, জাতীয় চরিত্র, শিল্প কাঠামাে, শিক্ষাক্রম, শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়ােগ, প্রশাসন ইত্যাদি পাঠের অন্তর্গত নয়। প্রকৃত অর্থে একটি দেশের শিক্ষা সম্পর্কীয় বিভিন্ন দিক যেমন—শিক্ষার মান, সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি অনুসারে উক্ত সমস্যা সমাধানের দিকনির্দেশনাও তুলনামূলক শিক্ষার অন্তর্গত। এছাড়া ক্যান্ডেলের বড়াে অবদান তিনি সমাজ ও বিদ্যালয়ের মধ্যে কার্যকারণ সংশ্লিষ্ট মতবাদ উপস্থাপন করেন যা তুলনামূলক শিক্ষার পরিসরকে বৃদ্ধি করে।

জর্জ বিয়ারডের মতামত: তিনি মত পােষণ করেন যে বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য থাকে এবং তাদের মধ্যে যে পারস্পরিক দোষ-গুণ বিদ্যমান, তাকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করাই এই শিক্ষার কাজ। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে মূলনীতিভিত্তিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করাই হচ্ছে তুলনামূলক শিক্ষার পরিসর। তিনি চেয়েছিলেন সামাজিক এবং দার্শনিক নীতির আলােকে দেশের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে এবং তা তুলনামূলক শিক্ষার পরিসরের অংশ হিসাবে স্থান করে নিবে।

ফিলিপ-ই-জোনসের মতামত : জোনসের মতে, “Comparative education with rapidly increasing resources and its hopes for better methods, seems admirably suited to provide a more rational basis for planning.”

Note: এই আর্টিকেলের ব্যাপারে তোমার মতামত জানাতে নীচে দেওয়া কমেন্ট বক্সে গিয়ে কমেন্ট করতে পারো। ধন্যবাদ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!