বুনিয়াদি শিক্ষার বা নঈ-তালিম শিক্ষার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করাে। এই শিক্ষার ত্রুটি কী?

বুনিয়াদি শিক্ষার বা নঈ-তালিম শিক্ষার বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করাে। এই শিক্ষার ত্রুটি কী?

উত্তর: 

বুনিয়াদি শিক্ষা বা নঈ-তালিম শিক্ষার বৈশিষ্ট্য : 

বুনিয়াদি শিক্ষার মধ্যে প্রতিফলিত হয় গান্ধিজির শিক্ষাদর্শন। তিনি মনে করতেন ভারতবর্ষের সামাজিক, নৈতিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব শিক্ষার মাধ্যমে। ফলে ভারতের আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শােষণমুক্তি ঘটবে। গান্ধিজির এই শিক্ষা পরিকল্পনা বুনিয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা নামে পরিচিত। অনেকে এই শিক্ষা পরিকল্পনাকে গুজরাটের ওয়ার্ধা পরিকল্পনাও বলে থাকেন। কারণ 1937 খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের ওয়ার্ধা নামক স্থানে গান্ধিজির এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই শিক্ষাকে পরবর্তীকালে ‘নঈ-তালিম’ বলে অভিহিত করা হয়। এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল— 

[1] অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা : গান্ধিজি চেয়েছিলেন সাত থেকে চোদ্দো বছর বয়েসের ছেলেমেয়েদের জন্য এই শিক্ষাক্রম হবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। 

[2] শিক্ষাভিত্তিক শিক্ষা : কোনাে একটি শিল্পকে কেন্দ্র করে এই শিক্ষা গড়ে উঠবে। স্থানীয় চাহিদা অনুসারে শিল্পটি নির্বাচিত হবে। শিল্পটি শুধু উৎপাদনের মাধ্যমে হবে তা নয়। এর মধ্য দিয়ে শিশুর চরিত্র গঠন হবে, তার অবসর বিনােদনের সুযােগ থাকবে। 

[3] শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয় : বুনিয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনায় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য শিক্ষণীয় দিকগুলি হল — (ক) মূল হস্তশিল্প যা সমাজজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত যথা— সুতা কাটা, তাঁত বােনা, কৃষিকাজ ইত্যাদি। (খ) শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা। (গ) দৈনন্দিন জীবনে প্রয়ােজনীয় গণিত। (ঘ) সমাজবিদ্যা। (ঙ) বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা। (ঘ) ছবি আঁকা, সংগীত ও কেবল মেয়েদের জন্য গার্হস্থ্যবিজ্ঞান। 

[4] স্বনির্ভরশীল শিক্ষা : তিনি মনে করতেন শিক্ষা হবে স্বনির্ভরশীল। শিশুদের দ্বারা উৎপন্ন দ্রব্যের বিক্রয়ের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করা হবে। 

[5] শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা : শিক্ষার্থী উৎপাদনশীল কর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযােগ পাবে। এর ফলে শ্রমের প্রতি মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।

[6] সামাজিক কল্যাণ বোধ : গান্ধিজি বলেছিলেন— ‘সব শিক্ষার লক্ষ্য হবে অবশ্যই সেবা করা’। জনগণের সেবামূলক কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করবে ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ববােধ ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে উঠবে। 

[7] সততার নীতি : শিক্ষাক্ষেত্র হবে সম্পূর্ণ হিংসা মুক্ত তা সত্যের ওপর নির্ভরশীল হবে। তাই বুনিয়াদি শিক্ষার সঙ্গে সহযােগিতার আদর্শ ও অহিংস নীতি যুক্ত। 

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় গান্ধিজির বুনিয়াদি শিক্ষা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বিরাট পরিবর্তন এনেছে। তার শিক্ষা পরিকল্পনা অনেক বাস্তবধর্মী এ ব্যাপারে কোনাে সন্দেহ নেই।

বুনিয়াদি শিক্ষার ব্যর্থতার দিক বা ত্রুটি : 

বুনিয়াদি শিক্ষার অসফলতার মূল কারণগুলি হল- (i) শিক্ষার যে-কোনাে স্তরে অর্থ উপার্জনের ভাবনা যুক্তিযুক্ত নয়। (ii) বুনিয়াদি শিক্ষায় এই শিল্পের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় সাধারণ শিক্ষা অনেকাংশে অবহেলিত হয়েছে। (iii) গ্রামের দরিদ্র মানুষের উপযােগী হলেও শহরে তা জনপ্রিয় হয়নি। (iv) সঠিক উপলব্ধি ছাড়া শিল্পের মাধ্যমে। শিক্ষালাভ বিজ্ঞানসম্মত নয়। (v) যােগ্য, প্রশিক্ষিত, শিক্ষক ও পরিকাঠামাের অভাব এই শিক্ষা ব্যর্থতার জন্য অনেকাংশে দায়ী। (vi) শিল্পবিপ্লব, দ্রুত আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতি—এই সবের সাপেক্ষে একটি মাত্র শিল্পকেন্দ্রিক শিক্ষা বুনিয়াদি শিক্ষায় ব্যর্থ হতে থাকে।

উপসংহার : তৎকালীন ভারতবর্ষ ছিল দারিদ্রক্লিষ্ট, দুঃখদুর্দশাপূর্ণ। বুনিয়াদি শিক্ষার সাফল্য ও ব্যর্থতা পর্যালােচনা করে বলা যায় বুনিয়াদি বা নঈ-তালিম শিক্ষা হল ভারতবাসীর ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের ভিত্তিভূমি ও গণতান্ত্রিক আদর্শের মূল চাবিকাঠি।

Note: এই আর্টিকেলের ব্যাপারে তোমার মতামত জানাতে নীচে দেওয়া কমেন্ট বক্সে গিয়ে কমেন্ট করতে পারো। ধন্যবাদ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!