বংশগতি কাকে বলে | শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব সম্পর্কিত পরীক্ষাগুলি সংক্ষেপে আলােচনা করাে

বংশগতি কাকে বলে | শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব সম্পর্কিত পরীক্ষাগুলি সংক্ষেপে আলােচনা করাে

উত্তর :

বংশগতি :

বংশগতি হল সেইসকল বৈশিষ্ট্যাবলি, যা শিশু জন্মসূত্রে জিনের মাধ্যমে তার পিতা-মাতার কাছ থেকে সরাসরিভাবে এবং তার অন্যান্য পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পরােক্ষভাবে পেয়ে থাকে।

বিশিষ্ট মনােবিদ স্টোন বংশগতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন — বংশগতি হল কোনাে ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ যা সে। তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে অর্জন করে।

জীববিজ্ঞানীদের মতে, একটি শিশু যে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তার পিতা-মাতার কাছ থেকে জন্মগতভাবে জিনের মাধ্যমে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, তাই হল বংশগতি।

মােটকথা বংশগতি হল ব্যক্তির সেইসকল সহজাত গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্যসমূহ যা নিয়ে সে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় এবং যা পরবর্তী পর্যায়ে পরিবেশের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে।

শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব সম্পর্কিত পরীক্ষা :

শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেবিষয়ে বহু পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে, এখানে কয়েকটি পরীক্ষা আলােচনা করা হল — 

[1] গ্যাল্টনের পরীক্ষা : শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—এটি বােঝা যায় গ্যাল্টনের পরীক্ষা থেকে। মনােবিদ গ্যাল্টন 1969 খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের 977 জন খ্যাতনামা ব্যক্তির বংশপঞ্জি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে দেখেন যে, তাদের মধ্যে 536 জন জীবনে খ্যাতি অর্জন করেছেন। অন্যদিকে 977 জন অতিসাধারণ ব্যক্তির বংশপঞ্জি বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দেখেন যে, তাদের মধ্যে মাত্র 4 জন খ্যাতি অর্জন করেছেন।

[2] গডার্ডের পরীক্ষা : 1914 খ্রিস্টাব্দে গডার্ড কালিকক পরিবারের বংশপঞ্জি সমীক্ষা করে দেখেন যে, ওই পরিবারের কর্তা মার্টিন কালিকক ছিলেন আমেরিকার একজন সৈনিক। তাঁর দুজন স্ত্রীর মধ্যে একজন ছিলেন বুদ্ধিমতী এবং অপরজন ছিলেন অল্পবুদ্ধিসম্পন্না। বুদ্ধিমতী স্ত্রীর প্রতিটি সন্তান বুদ্ধিমান ও সামাজিক। অন্যদিকে অল্পবুদ্ধিসম্পন্না স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে বেশিরভাগ স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন ও অসামাজিক। এই সমীক্ষা থেকে তিনি বলেন শিশুর জীবন বিকাশে বংশগতির প্রভাব থাকায় বুদ্ধিমতী স্ত্রীর সন্তানেরা বুদ্ধিমান এবং স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্না স্ত্রীর সন্তানেরা স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন হয়েছে। 

[3] ডাগডেলের পরীক্ষা : শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব রয়েছে কিনা তা যাচাই করার জন্য ডাগলে একটি পরিবারের পাঁচ পুরুষের বংশপঞ্জি সম্পর্কে তথ্যসংগ্রহ করেন। ডিউক নামে এক কয়েদির পাঁচ পুরুষের বংশপঞ্জি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়—ওই পরিবারের সদস্যরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুরি, ডাকাতি, খুন প্রভৃতি অসামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

[4] টারম্যানের পরীক্ষা : শিশুর জীবন বিকাশে বংশগতির প্রভাব সম্পর্কে সমীক্ষা করতে গিয়ে মনােবিদ টারম্যান প্রায় এক হাজার ছেলেমেয়ের বুদ্ধ্যঙ্ক (IQ) পরিমাপ করেন এবং তাদের প্রত্যেকের পিতা-মাতার সঙ্গে বুদ্ধ্যঙ্কের তুলনা করে। এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, শিশুর বুদ্ধির সঙ্গে তার পিতা-মাতার বুদ্ধ্যঙ্কের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। 

[5] নিউম্যানের পরীক্ষা : শিশুর জীবন বিকাশে বংশগতির প্রভাব কতখানি তা জানার জন্য ফ্রেড এবং এডুইন নামে দুটি সমকোশী যমজ শিশুর ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা চালান। ওই দুই শিশু খুব অল্পবয়স থেকেই দুটি ভিন্ন পরিবেশে বড়াে হতে থাকে। 26 বছর পরে নিউম্যান লক্ষ করেন ওই দুজন দুই ভিন্ন। পরিবেশে লালিতপালিত হলেও তাদের মধ্যে অসম্ভব রকমের মিল রয়েছে। এটি বংশগতির সপক্ষেই প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়। এই জাতীয় পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ভিত্তিতে। বংশগতিবাদীরা মনে করেন শিশুর জীবন বিকাশের ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাবই সবথেকে বেশি। উন্নত বংশজাত শিশুরাই শিক্ষাক্ষেত্রে অধিক সফল হয়। বংশগতি সঠিক পর্যায়ের -হলে শিক্ষার অধিকাংশ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়।

Note: এই আর্টিকেলের ব্যাপারে তোমার মতামত জানাতে নীচে দেওয়া কমেন্ট বক্সে গিয়ে কমেন্ট করতে পারো। ধন্যবাদ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!